



"দীর্ঘ বিরতির পর ৫০ বছর বয়সে পড়াশোনায় ফিরে ৫৯ বছরে অনার্স পাস করেছেন বেলায়েত শেখ। তাঁর যাত্রা থেকে জানুন ফিরে দাঁড়ানোর বাস্তব পাঠ।"
১৯৮৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল বেলায়েত শেখের। কিন্তু পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য জোগাড় করা টাকা অসুস্থ বাবার চিকিৎসায় খরচ করতে হয়। বড় সন্তান হিসেবে পরিবারের দায়িত্বও এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। ফলে পড়াশোনা থামিয়ে জীবিকার পথে নামতে হয়। সেই বিরতি কয়েক মাসের ছিল না—ছিল কয়েক দশকের।
তবু অপূর্ণ ইচ্ছাটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ২০১৭ সালে, ৫০ বছর বয়সে, ঢাকার দারুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন বেলায়েত শেখ। ২০১৯ সালে এসএসসি এবং ২০২১ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেলেও উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য ছাড়েননি। ২০২২ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হন।
২০২৬ সালের আগস্টে, ৫৯ বছর বয়সে, তিনি অনার্স সম্পন্ন করেন। স্কুলে ফিরে আসা থেকে স্নাতক হওয়া পর্যন্ত পুরো যাত্রায় তাঁর সময় লেগেছে প্রায় নয় বছর।
এসএসসি ও এইচএসসি শেষ করার পর বেলায়েত শেখ দেশের কয়েকটি বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বসেছিলেন। কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাননি। সাধারণত এখানেই অনেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে—"আমার দ্বারা হবে না।"
বেলায়েত শেখ ফলটিকে নিজের সামর্থ্যের চূড়ান্ত রায় হিসেবে নেননি। বিশ্ববিদ্যালয় বদলেছেন, কিন্তু পড়ার লক্ষ্য ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য খুব সরাসরি একটি শিক্ষা আছে: নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়া এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়া এক কথা নয়। পছন্দের প্রথম দরজাটি বন্ধ হলে বিকল্প প্রতিষ্ঠান, বিষয় বা শিক্ষাপথ খুঁজতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বেলায়েত শেখের অধিকাংশ সহপাঠী ছিলেন তাঁর চেয়ে অনেক কম বয়সী। এর সঙ্গে ছিল পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিন পর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় ফেরার চাপ। তবু তিনি নিয়মিত ক্লাস করেছেন, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়েছেন, পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন এবং শিক্ষা সফরসহ বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন।
ইংরেজিতে দুর্বলতাও তাঁর জন্য একটি বাধা ছিল। সেই ঘাটতি সামলাতে তিনি অনুবাদ ও বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংবাদিকতার কাজ চালিয়ে গাজীপুর থেকে ঢাকায় এসে ক্লাস করেছেন।
অর্থাৎ, তিনি দুর্বলতাকে অস্বীকার করেননি; দুর্বলতার পাশে একটি ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা বসিয়েছেন। ইংরেজি কঠিন হলে অনুবাদ ব্যবহার করেছেন, নিয়মিত ক্লাসের জন্য যাতায়াত করেছেন এবং বয়সের ব্যবধানকে ক্লাস এড়িয়ে যাওয়ার কারণ বানাননি।
বেলায়েত শেখ ঠিক কখন ঘুম থেকে উঠতেন বা দৈনিক কত ঘণ্টা পড়তেন—এমন বিস্তারিত তথ্য নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়নি। তাই তাঁর নামে "প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা পড়তেন" ধরনের দাবি করা ঠিক হবে না।
তবে চাকরি, পরিবার ও পড়াশোনা একসঙ্গে চালানো শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর পথচলার সঙ্গে মিল রেখে একটি বাস্তব রুটিন হতে পারে—
এখানে লক্ষ্য আট বা দশ ঘণ্টা পড়া নয়। দায়িত্বের ভেতর থেকেও প্রতিদিন পড়াশোনার সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
বেলায়েত শেখের গল্প সরাসরি কোনো এমসিকিউ ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির বিবরণ নয়। তবে তাঁর ধারাবাহিকতা ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্যও দরকারি। কারণ ভর্তি প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় পড়ার ছন্দ ভেঙে গেলে।
প্রশ্নব্যাংক সমাধানের সময় শুধু সঠিক উত্তর গুনলে চলবে না। ভুলগুলো তিন ভাগে আলাদা করো—
পরের মডেল টেস্টের আগে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধরনের ভুল কমানো তুলনামূলক সহজ। এতে নতুন অধ্যায় না পড়েও স্কোর বাড়তে পারে।
তাঁর পড়াশোনায় কয়েক দশকের বিরতি ছিল। তারপরও তিনি নবম শ্রেণি থেকে আবার শুরু করেছেন। তোমার ছয় মাস বা এক বছরের বিরতি তাই ফেরার পথ বন্ধ করে দেয় না।
তিনি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি। প্রথমে নবম শ্রেণি, তারপর এসএসসি, এইচএসসি এবং শেষে স্নাতক—প্রতিটি ধাপ শেষ করেছেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাননি, কিন্তু অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।
ইংরেজিতে সমস্যা থাকায় অনুবাদ ও অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করেছেন। দুর্বল বিষয় লুকিয়ে না রেখে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়াই কার্যকর পথ।
২০১৭ থেকে ২০২৬—প্রায় নয় বছরের পথ। এক দিনের প্রচণ্ড অনুপ্রেরণা নয়, বহু দিনের ছোট ছোট কাজ তাঁকে শেষ পর্যন্ত ডিগ্রির কাছে নিয়ে গেছে।
হয়তো পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে, একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হয়েছে, ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পাওনি কিংবা কয়েক মাস বই থেকে দূরে ছিলে। ফিরে আসতে প্রথম দিনেই পুরোনো গতি দরকার নেই।
আজ একটি অধ্যায় খোলো। ৩০ মিনিট পড়ো। এরপর ২০টি প্রশ্ন সমাধান করে ভুলগুলো লিখে রাখো। আগামীকাল একই সময়ে আবার বসো। বেলায়েত শেখের যাত্রা একটি বড় কথা খুব সাধারণভাবে মনে করিয়ে দেয়—ফিরে আসার জন্য নিখুঁত সময় লাগে না; লাগে প্রথম ছোট পদক্ষেপটি।
Author & Contributor
No comments yet. Be the first to comment!