



"পরীক্ষার হলে গিয়ে পড়া ভুলে যাওয়ার দিন এবার শেষ। বাস্তব জীবনের নানা মজার উদাহরণ এবং ৫টি পরীক্ষিত বৈজ্ঞানিক কৌশলের মাধ্যমে কীভাবে যেকোনো কঠিন পড়া খুব সহজে আজীবন মনে রাখা যায়, তা এই বিস্তারিত পোস্টে আলোচনা করা হলো।"
পড়ার টেবিলে আমরা সবাই কমবেশি একটা অদ্ভুত জাদুর মুখোমুখি হই। ধরুন, আপনি টানা দুই ঘণ্টা ধরে ইতিহাসের একটি কঠিন অধ্যায় বা বিজ্ঞানের জটিল কোনো বিক্রিয়া মুখস্থ করলেন। পড়া শেষে আপনার মনে হলো, বাহ, এবার তো সব পারি। কিন্তু ঠিক তিন দিন পর যখন ওই চ্যাপ্টারের কোনো প্রশ্ন আপনার সামনে আসে, তখন মনে হয় জীবনে প্রথমবার এই লেখাগুলো দেখছেন। মাথার ভেতর পুরো ফাঁকা।
আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এমন কেন হয়। বিজ্ঞান বলছে, আমাদের মস্তিষ্ক কোনো ত্রুটিপূর্ণ পেনড্রাইভ নয় যে তথ্য নিজে নিজেই ডিলিট হয়ে যাবে। আসল সমস্যা হলো, আমরা তথ্যগুলো ভুল উপায়ে মাথায় ঢোকাচ্ছি। কম্পিউটার বা মোবাইলে যেমন ফাইল গুছিয়ে ফোল্ডার করে না রাখলে পরে খুঁজে পাওয়া যায় না, আমাদের মস্তিষ্কের স্মৃতিগুলোকেও তেমনি সঠিক ফোল্ডারে গুছিয়ে রাখতে হয়। পড়াশোনাকে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে রূপান্তর করার জন্য বিশ্বজুড়ে সফল শিক্ষার্থীরা ৫টি জাদুকরী ও বৈজ্ঞানিক মেমোরি হ্যাকস ব্যবহার করে থাকেন। আসুন বাস্তব জীবনের ছোট ছোট উদাহরণের মাধ্যমে সেগুলো সহজভাবে বুঝে নেওয়া যাক।
এই পদ্ধতির আবিষ্কারক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী রিচার্ড ফেইম্যান। তিনি বলতেন, আপনি যদি কোনো বিষয় একদম সহজ করে কাউকে বোঝাতে না পারেন, তার মানে আপনি নিজেই বিষয়টি বোঝেননি।
ধরুন, আপনি বিজ্ঞানের গ্রীনহাউস প্রভাব বা ট্যাক্সেশনের কোনো জটিল নিয়ম পড়েছেন। এবার বইটা বন্ধ করুন। মনে মনে ভাবুন, আপনার সামনে আপনার ১০ বছরের ছোট বোন বা কোনো এক পিচ্চি ভাগ্নে বসে আছে। তাকে এই পড়াটা এমনভাবে গল্প শুনিয়ে বোঝান যেন সে একবারে বুঝে যায়। আপনি যখন তাকে বলতে যাবেন যে ক্লোরোফ্লোরোকার্বন ওজোন স্তর ফুটো করে দিচ্ছে, তখন বাচ্চার মতো করে বলুন, ধরো আকাশের ওপর একটা ছাতা আছে, আর এই গ্যাসটা গিয়ে সেই ছাতায় ছোট ছোট ফুটো করে দিচ্ছে। এই গল্পটা বলতে গিয়ে আপনি যেখানেই আটকে যাবেন বা যে অংশটি সহজ করতে পারবেন না, বুঝে নেবেন ঠিক সেই জায়গাটিতেই আপনার নিজের বোঝার খামতি আছে। তখন আবার বই খুলে সেই নির্দিষ্ট অংশটি দেখে নিন। অন্যকে শেখানোর এই অভিনয়টি করলে পড়া মাথায় একদম গেঁথে যায়।
আমরা যেকোনো নতুন তথ্য শেখার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার প্রায় ৭০ শতাংশই ভুলে যাই। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ফরগেটিং কার্ভ বা ভুলে যাওয়ার বক্ররেখা বলা হয়। এই ভুলে যাওয়া ঠেকাতে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো স্পেসড রেপিটিশন বা একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে পড়াটি আবার মনে করা।
আমরা যখন নতুন কোনো মানুষের সাথে পরিচিত হই, প্রথম দিনই তার নাম মনে রাখা কঠিন হয়। কিন্তু পরের দিন অফিসে বা স্কুলে তার সাথে দেখা হলে আমরা যখন বলি, হাই রাফসান, কেমন আছ। তখন নামটা মনে পড়ে। এর ৩ দিন পর আবার দেখা হলে নামটা আরও চেনা লাগে। এভাবে কিছুদিন পর আমরা তার নাম আর কখনোই ভুলি না। পড়াশোনাটাও ঠিক এইরকম। এক রাতে একটা পুরো বই ১০ বার রিডিং না পড়ে, আপনি আজকে একটা চ্যাপ্টার পড়ুন। তারপর সেটা আগামীকাল একবার চোখ বুলিয়ে নিন। এরপর ৩ দিন পর একবার, ৭ দিন পর একবার এবং ১৫ দিন পর শেষবারের মতো একবার রিভিশন দিন। এই যে সময়ের ব্যবধান বাড়িয়ে বারবার মস্তিষ্ককে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এতে মস্তিষ্ক বুঝে নেয় যে এই তথ্যটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটিকে স্থায়ী স্মৃতির বক্সে পাঠিয়ে দেয়।
অধিকাংশ শিক্ষার্থী রিভিশন দেওয়ার সময় একটা মস্ত বড় ভুল করে। তারা বই খুলে হাইলাইটার দিয়ে দাগানো লাইনগুলো বারবার রিডিং পড়ে যায়। একে বলা হয় প্যাসিভ লার্নিং বা অলস পড়া। এতে চোখের ব্যায়াম হয়, কিন্তু মস্তিষ্কের কোনো খাটুনি হয় না।
আপনি যদি কোনো এলাকায় নিজে গাড়ি চালিয়ে যান, তবে রাস্তাটা আপনার যেমন মনে থাকবে, আপনি যদি অন্য কারও গাড়ির পেছনে বসে শুধু চারপাশ দেখতে দেখতে যান, তবে কিন্তু রাস্তা মনে থাকবে না। একটিভ রিকল হলো নিজে গাড়ি চালানোর মতো। একটি পৃষ্ঠা বা প্যারাগ্রাফ পড়ার পর বই পুরোপুরি বন্ধ করে দিন। এবার একটা সাদা কাগজ নিয়ে আপনি না দেখে যা যা মনে করতে পারছেন, তা হিজিবিজি করে হলেও পয়েন্ট আকারে লিখুন। অথবা চোখ বন্ধ করে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করুন যে এই মাত্র আমি কী পড়লাম। মস্তিষ্ক যখন জোর করে ভেতরের স্মৃতি টেনে বের করার জন্য খাটুনি করে, তখন সেই পড়ার নিউরাল কানেকশন বা জোড় এতটাই শক্ত হয় যে পরীক্ষার হলে কলম আর আটকে থাকে না।
আমাদের মস্তিষ্ক টেক্সট বা খটমটে লেখার চেয়ে ছবি, কাল্পনিক দৃশ্য এবং খুব পরিচিত জায়গা অনেক দ্রুত মনে রাখতে পারে। মেথড অব লোকি হলো আপনার চেনা কোনো জায়গার সাথে পড়ার তথ্যগুলোকে মিলিয়ে ফেলা।
আপনি চোখ বন্ধ করলেও আপনার নিজের ঘরের খাট কোথায়, আলমারি কোথায়, ওয়াশরুম কোন দিকে, তা একদম পরিষ্কার দেখতে পান। কারণ এই জায়গার ম্যাপ আপনার মাথায় সেভ করা আছে। এবার ধরুন, আপনাকে সাধারণ জ্ঞানের একটা তালিকায় পাঁচটি দেশের নাম ও তাদের মুদ্রার নাম মনে রাখতে হবে। আপনি মনে মনে কল্পনা করুন, আপনার ঘরের দরজায় একটা বড় ডলারের সাইন ঝুলছে অর্থাৎ প্রথম দেশ। আপনার পড়ার টেবিলের ওপর জাপানি ইয়েন ওয়ান ওড়ানো হচ্ছে অর্থাৎ দ্বিতীয় দেশ। আপনার বিছানার বালিশের নিচে ভারতের রুপি লুকানো আছে অর্থাৎ তৃতীয় দেশ। এইভাবে আপনার চেনা ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্রের সাথে পড়াগুলোকে কাল্পনিক বা অদ্ভুত ছবির মাধ্যমে লিংক করে দিন। পরীক্ষার হলে আপনি যখন চোখ বন্ধ করে আপনার ঘরের ভেতর দিয়ে মনে মনে হেঁটে যাবেন, ঘরের জিনিসগুলো দেখার সাথে সাথেই সেই কঠিন পড়াগুলো ম্যাজিকের মতো স্ক্রিনে ভেসে উঠবে।
যেকোনো কঠিন তালিকা, সূত্র বা বড় বড় পয়েন্ট মনে রাখার জন্য ছড়া, সংক্ষিপ্ত রূপ বা মেমোনিক্স তৈরি করা অত্যন্ত প্রাচীন ও কার্যকর একটি কৌশল।
আমরা ছোটবেলায় রংধনুর সাতটি রঙ সিরিয়ালি মনে রাখার জন্য বেনীআসহকলা শব্দটা মুখস্থ করেছিলাম। ঠিক একইভাবে আপনি যেকোনো কঠিন বিষয়ের প্রথম অক্ষরগুলো নিয়ে নিজের মতো করে ফানি কোনো বাক্য বানিয়ে নিতে পারেন। যেমন রসায়নের কোনো জটিল বিক্রিয়া মনে রাখার জন্য আপনি আপনার বন্ধুদের নাম দিয়ে একটা মজার গল্প বানিয়ে নিতে পারেন। পড়াটা যত বেশি অদ্ভুত ও হাসির হবে, মস্তিষ্ক সেটা তত বেশি আনন্দের সাথে লুফে নেবে। রসকসহীন পড়ার চেয়ে এমন রসাত্মক উপায়ে পড়া জিনিস মানুষ কখনোই ভোলে না।
স্মৃতিশক্তি কোনো ঈশ্বরপ্রদত্ত অলৌকিক ক্ষমতা নয় যে কেউ কম বা বেশি নিয়ে জন্মায়। এটি একটি স্কিল বা দক্ষতা, যা সঠিক কৌশল অনুশীলনের মাধ্যমে যে কেউ বাড়াতে পারে। তাই মুখস্থ করার অন্ধ অভ্যাস আজই বদলে ফেলুন এবং এই মেমোরি হ্যাকসগুলো দিয়ে পড়ালেখাকে করে তুলুন সহজ ও চমৎকার।
Author & Contributor
No comments yet. Be the first to comment!